আমরা কুরআন হাদিস ছাড়া কিছু মানি না এই দাবির বাস্তবতা

 

আমরা কোরআন–হাদিস ছাড়া কিছু মানি না — এই দাবির বাস্তবতা

✍️ লেখক: Alauddin Rahmani |২২/১২/২০২৫ ইং 
ছবি সংগৃহীত 


আমাদের দেশে কিছু লোক দাবি করে, তারা কোরআন–হাদিস ছাড়া কিছুই মানে না। কিন্তু তাদের এই দাবি একেবারেই বাস্তবতাবিরোধী। স্বয়ং তাদের দিকেই তাকান—তাদের কোনো কিছু জানার প্রয়োজন হলে তারা কোরআন–হাদিস খুলে দেখে না; বরং তাদের শায়েখকে জিজ্ঞেস করে। এমনকি তাদের মাহফিলগুলোতেও প্রশ্নোত্তরের একটি পর্ব থাকে। নামাজ শেখা, যাকাতের বিধান, হজের বিধান—এসব তারা সরাসরি কোরআন ও হাদিস থেকে শেখে না; বরং তাদের শায়েখদের লিখিত বই পড়ে শেখে। সুতরাং তাদের কথা ও কাজে কোনো মিল নেই। এই ধরনের লোকদেরকে আল্লাহ তাআলা নিন্দা করেছেন, আর এটা মুনাফিকদের স্বভাব।
এখন হয়তো আপনি প্রশ্ন করতে পারেন—যারা জানে না, তারা যারা জানে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবে; এটা তো কোরআনেরই নির্দেশ। এতে খারাপের কী আছে? এর জবাবে আমি বলব, মূলত এটাই বাস্তবতা—যা কখনো অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু ফেতনাবাজরাই এটি অস্বীকার করে। যারা মাযহাব অনুসরণ করে, তারাও তাদের আলেমদেরকে জিজ্ঞেস করে আমল করে। এটা যদি পথভ্রষ্টতা হয়, তাহলে তাদেরটা কেন পথভ্রষ্টতা হবে না? এটা যদি হারাম হয়, তাহলে তাদেরটা কেন হারাম হবে না? সুতরাং তাদের মাঝে এবং মাযহাব অনুসরণকারীদের মাঝে পার্থক্য কোথায়?
পার্থক্য হলো—তারা মুখে বলে এক কথা, আর কাজে করে আরেকটা। আর মাযহাব অনুসারীরা যা বাস্তব, তাই স্বীকার করে।
আমি এক আহলে হাদিসকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—আপনি তো কোরআন ও হাদিস মানেন? সে বলল, হ্যাঁ, একদম ঠিক। তখন আমি তাকে একটি ছোট বই দিলাম। সেখানে ‘আমীন’ আস্তে বলার বিষয়ে বহু হাদিস ও আরও অনেক দলিল ছিল। আমি তাকে বললাম—আপনি এগুলো অনুযায়ী আমল করুন। তখন সে বলল, “বাবা, আমরা সাধারণ মানুষ; রিকশা চালিয়ে খাই। কোরআন–হাদিস পড়ার সময় পাই না। আমরা এগুলো কী বুঝব? আমাদের শায়েখ শহিদুল্লাহ মাদানী আমাদেরকে যেভাবে বলেছেন, আমরা সেভাবেই আমল করি। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি আমাদেরকে ভুল কিছু বলেননি; কোরআন–হাদিস থেকেই বলেছেন।”
তাদের মধ্যে যারা বাংলা পড়তে পারেন, তারা হয়তো বলবেন—এই হাদিস অমুক কিতাবের অমুক নম্বরে আছে। কিন্তু দলিল হিসেবে কি এটুকুই যথেষ্ট? হাদিস অনুযায়ী আমল করার জন্য কি শুধু বাংলা অনুবাদ জানা যথেষ্ট? কখনোই নয়।
কুরআন হাদিসের মর্ম বোঝার জন্য আরবি ভাষায় গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করতে হয়—ইলমুস সরফ, ইলমুন নাহু, ইলমুল বালাগাত, ইলমুল মাআনি, ইলমুল বয়ান, উসুলে তাফসির, উসুলে ফিকহ, হাদিসের পরিভাষাগত জ্ঞান, ইলমুল জারহ ও তাদিল, ইলমুর রিজাল, ইলমু তাখরিজিল হাদিসসহ আরও বহু শাস্ত্রের প্রয়োজন হয়। এসব অর্জন করতে দীর্ঘ এক যুগ সময় ব্যয় করতে হয়। আহলে হাদিসদের সবাই কি এই যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে? অবশ্যই পারবে না। সুতরাং তাদের অন্যকে অনুসরণ করতেই হবে। তাহলে “আমরা কোরআন–হাদিস ছাড়া কিছু মানি না”—এই কথার অর্থই বা কী রইল?
এবার লক্ষ্য করুন—একজন মাযহাব অনুসারী ব্যক্তিও ঠিক এভাবেই আমল করে। অর্থাৎ তিনি বিশ্বাস করেন, তাদের আলেমগণ যে আমল শিক্ষা দেন, তা কোরআন ও হাদিস অনুযায়ীই দেন। এই বিশ্বাস অনুযায়ী আমল করাই হলো তাকলিদের আসল রূপ।
তবে কেউ যদি বলে—আমার হুজুর বা শায়েখ যা বলবেন, কোরআন–হাদিসের বিরোধী হলেও আমি সেটাই মানব—তাহলে এটি অবশ্যই পথভ্রষ্টতা এবং হারাম। এই অর্থে তাকলিদ হারাম—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মাযহাবিদের কেউ এই অর্থে তাকলিদ করে না। সুতরাং বাস্তবতাবিরোধী বক্তব্য দিয়ে সমাজে ফেতনা সৃষ্টি করবেন না।
এখন কথা হলো—তারা কেন শুধু তাদের নিজস্ব ঘরানার শায়েখদের কথা শোনে, অন্য আলেমদের কথা শোনে না? কারণ তাদের শায়েখরা চরম মিথ্যা প্রচার করেছে—যে শুধু তারাই হক, অন্যরা বাতিল। অন্যদের বাতিল প্রমাণ করার জন্য তারা ব্যাপক জালিয়াতি করেছে। যেমন তারা মিথ্যা ছড়িয়েছে—মাযহাবীদের সব হাদিসই জয়িফ, তারা কোরআন–হাদিস মানে না, শুধু ইমামদের কথা মানে। ফলে সাধারণ মানুষ আলেমদের থেকে দূরে সরে গেছে এবং তাদেরকেই আঁকড়ে ধরেছে।
তারা এমন লোকদের তাকলিদ করে, যারা অযোগ্য—কোরআন ও হাদিসের মর্ম বোঝার ক্ষমতা যাদের নেই। এর আরও বহু প্রমাণ আছে। এজন্যই আপনি দেখবেন, তাদের অনেক আমল সাহাবিদের আমলের সাথে সাংঘর্ষিক—যেমন জুমার দিনে দুই আযান, তারাবির নামাজ ২০ রাকাত, তিন তালাক কার্যকর হওয়া, নারীদের মসজিদে না যাওয়া—ইত্যাদি।

বাস্তবতাবিরোধী স্লোগান দিয়ে দ্বীনের নামে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা ফিতনার অন্তর্ভুক্ত। আমাদের উচিত কোরআন–সুন্নাহকে যথাযথ পদ্ধতিতে বোঝা ও মানা।

#কোরআন-হাদিস, তাকলিদ, মাযহাব, আহলে হাদিস, ফিতনা, ইসলামি চিন্তাধারা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

লেখাটি কেমন লাগলো? কমেন্ট করে জানালে খুব খুশি হবো।