ফিরে এসে খাব
রামগতি, লক্ষ্মীপুর · ২২ এপ্রিল ২০২৬
চোখ দুটো আর আগের মতো দেখে না। কিন্তু অপেক্ষার অভ্যাস যায়নি। রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন — যেন কেউ একজন আসবে। লুঙ্গি গুটিয়ে, পাঞ্জাবির বোতাম আলগা করে, ক্লান্ত পায়ে হেঁটে আসবে আর বলবে, "মা, ভাত দাও।"
কিন্তু তেরো বছর ধরে সে পা আর পড়েনি এই উঠোনে।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় বসেন। প্রতিদিন অপেক্ষা করেন। প্রতিদিন ফিরে যান খালি হাতে। কিন্তু পরদিন আবার আসেন — কারণ একটা মা কখনো আশা ছাড়তে পারেন না।
২০২৬ সালের মার্চ মাসে তরুণ সাংবাদিক আরমান হোসেন প্রথমবার এসেছিল নারায়ণগঞ্জের এই ছোট গ্রামে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখবে বলে। শাপলা চত্বরের সেই রাতের কথা। যে রাতের কথা অনেকেই বলে, কিন্তু কেউ পুরোটা বলে না।
রাহেলা বেগমের দরজায় দাঁড়িয়ে সে ডাকল, "খালাম্মা?"
বৃদ্ধা মাথা তুললেন। চোখে কোনো বিস্ময় নেই। যেন জানতেন কেউ একদিন আসবে। "আসো বাবা। বসো।"
আরমান উঠোনের মাটিতে বসল। নোটবুক বের করল না। কলম ধরল না। কেবল বলল, "খালাম্মা, আপনার ছেলের কথা বলবেন?"
রাহেলা বেগম কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। উঠোনের কোণে একটা নিমগাছ — তার পাতা নড়ছে বাতাসে। সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন সেই পাতার ভেতর কোথাও একটা মুখ লুকিয়ে আছে।
"আমার রফিক ছিল শান্ত ছেলে। মাদ্রাসায় পড়ত। কুরআন মুখস্থ করত রাত জেগে। গলার স্বর এত সুন্দর ছিল — ফজরের আজান শুনলে মনে হতো আকাশ থেকে নামছে।"
ছোটবেলায় একবার বাজার থেকে ফিরতে দেরি হয়েছিল। আমি রাগ করে দরজা বন্ধ করে দিলাম। সে বাইরে দাঁড়িয়ে রইল — রাগ করল না, কষ্ট পেল না। শুধু বলল, 'মা, রাগ কোরো না। মাফ করো।'
এখন মনে হয় — সেদিন কেন দরজা বন্ধ করেছিলাম? কেন বুকে টেনে নিইনি? কেন বলিনি — তুই আমার সব, তোকে ছাড়া আমি বাঁচব না?
সেদিন সকালে বলল, 'মা, ঢাকা যাব।' আমি ভাত বাড়ছিলাম। বললাম, 'খেয়ে যা।' ও বলল, 'ফিরে এসে খাব।'
"সেই ভাত আজও পাতিলে পড়ে আছে — আমার বুকের ভেতর।"
বৃদ্ধার কণ্ঠ কাঁপল না। তেরো বছরে কান্না বোধহয় শুকিয়ে গেছে। শুধু চোখের কোণে একটু জল জমল — তারপর সেটাও মিলিয়ে গেল। যেন সেই চোখও ক্লান্ত হয়ে গেছে কাঁদতে কাঁদতে।
রফিক তখন বিশ বছরের তরুণ। পাঁচ মে ২০১৩। শাপলা চত্বর। মতিঝিল।
সারাদেশ থেকে মানুষ এসেছে। বাস, ট্রাক, ট্রেন — ঢেউয়ের মতো মানুষ। রফিক এসেছিল তার মাদ্রাসার দশজন সহপাঠীকে নিয়ে। হাতে পানির বোতল। পকেটে মায়ের দেওয়া পঞ্চাশ টাকা। আর বুকে একটাই স্বপ্ন — নবীজির ﷺ সম্মানের জন্য আজ কণ্ঠ তুলবে।
তারপর এলো সেই রাত। সেই ভয়ংকর, নিষ্ঠুর, ইতিহাসের পাতায় লেখা না-থাকা রাত।
হঠাৎ বিদ্যুৎ গেল। এক নিমেষে পুরো মতিঝিল ডুবে গেল ঘুটঘুটে অন্ধকারে। যেন কেউ ইচ্ছে করে চোখ বেঁধে দিল লক্ষ মানুষের। টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেল — যারা বাইরে থেকে দেখছিল, তারাও অন্ধ হয়ে গেল।
তারপর শব্দ এলো। বুটের শব্দ। ভারী, একতালে, মাটি কাঁপানো শব্দ। লাঠির শব্দ। আর এমন কিছু শব্দ — যা কোনো মানুষ কানে শুনলে বুঝতে পারে না, শুধু শরীর বুঝে যায়। শুধু বুক কেঁপে ওঠে।
চিৎকার উঠল চারদিক থেকে। আল্লাহর নাম ধরে ডাক। আর দিগ্বিদিক ছুটে যাওয়ার শব্দ।
রফিক উঠে দাঁড়াল। বন্ধু তার হাত চেপে ধরে প্রায় টেনে নিয়ে যেতে চাইল — "রফিক, এখানে দাঁড়াস না! চল! চল আমার সাথে!"
তারা ছুটল। একসাথে। অন্ধকারে।
তারপর একটা শব্দ হলো। রফিক থমকে গেল। হাঁটু ভাঁজ হয়ে গেল আস্তে আস্তে — যেন ঘুমিয়ে পড়ছে। বন্ধু চিৎকার করল, "রফিক!" শুধু দেখল — রফিক মাটিতে। তারপর ভিড় তাকেও ভাসিয়ে নিয়ে গেল। রফিকের কণ্ঠ আর শোনা গেল না।
সেই অন্ধকার রাতে একটা মা নারায়ণগঞ্জের ছোট ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন। হয়তো সেই রাতে ঘুমের মধ্যে একবার চমকে উঠেছিলেন। হয়তো বুকের ভেতর কিছু একটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল। একটা মায়ের বুক সন্তানের কষ্ট টের পায়।
"তিনদিন পরে তার মাদ্রাসার বন্ধু ফিরে এসেছিল," রাহেলা বেগম বললেন। "দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। কথা বলতে পারছিল না। আমি বললাম, 'রফিক কোথায়?' সে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।"
"আমি তাকে মাফ করে দিলাম। বললাম, তুমি দোষ করোনি বাবা। কিন্তু মনে মনে বললাম — আল্লাহ, আমার ছেলেকে কোথায় রেখেছ? একবার জানাও। শুধু একবার।"
পরদিন সকালে বিদায় নেওয়ার সময় রাহেলা বেগম আরমানের হাতে একটা জিনিস দিলেন। একটা পুরনো ডায়েরি। মলাটে ছোট করে লেখা — রফিক। "যাওয়ার আগের রাতে লিখেছিল।"
"কাল যাব শাপলার কাছে। এই দেশে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা আল্লাহকে মানে না, নবীজিকে ﷺ ভালোবাসে না — বরং তাঁকে নিয়ে কটূক্তি করে, ইসলামকে নিয়ে ঠাট্টা করে। তারা ভাবে, কেউ প্রতিবাদ করবে না। কিন্তু আমি চুপ থাকতে পারব না। যে নবীর ﷺ কদমের ধুলোর মূল্য আমার জীবনের চেয়ে বেশি — তাঁর সম্মানে যদি একটিবারও কণ্ঠ না তুলি, তাহলে এই জীবন দিয়ে কী হবে? মা জানলে হয়তো যেতে দিতেন না। তাই বলিনি। মা, তুমি যদি কখনো এই লেখা পড়ো — রাগ কোরো না। তোমার ছেলে ভুল করেনি। শুধু ভালোবাসতে গিয়েছিল। আল্লাহ আমার সাথে আছেন।"
আরমান আর পড়তে পারল না। চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল। একটা বিশ বছরের ছেলে। মাকে না জানিয়ে গেছে — কারণ মা আটকে দেবেন। কিন্তু যাওয়ার আগে মাকে একটা চিঠি লিখে গেছে — যেন মা একদিন পড়েন।
"কিছু বলতে হবে না বাবা। শুধু একটু দোয়া করো — আল্লাহ যেন আমার রফিককে ভালো রাখেন। যেখানেই থাকুক।"
আরমান ফিরে গেল শহরে। প্রতিবেদন লেখা হলো। কিন্তু ছাপা হলো না — কারণ কিছু সত্য আছে, যা ক্ষমতাবানরা কখনো ছাপতে দেয় না। শুধু একটাই দরকার ছিল। একটা ছেলের পায়ের শব্দ। দরজায় এসে বলবে — "মা, ভাত দাও।" সেই শব্দ আর আসে না।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় বৃদ্ধা বসেন। রাস্তার দিকে তাকান। বাতাসে নিমপাতা নড়ে। দূর থেকে আজানের সুর ভেসে আসে। মনে হয় — সেই সুরটা যেন রফিকের গলার মতো।
শাপলা ফোটে প্রতিবছর। কাদার ভেতর। অন্ধকারের ভেতর। আঘাতের পরেও। তবু ফোটে। মাথা উঁচু করে ফোটে। এই দেশের বুকে কত রফিক হারিয়ে আছে — নাম নেই, খোঁজ নেই, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। শুধু একজন মা আছেন। দরজায় বসে আছেন। অপেক্ষা করছেন। সেই লেখা মুছে যায় না। কারণ কিছু কিছু গল্প — শেষ হয় না কখনো।
একটা মায়ের বুকের ভেতর। চিরকালের জন্য।

0 মন্তব্যসমূহ
লেখাটি কেমন লাগলো? কমেন্ট করে জানালে খুব খুশি হবো।