শাপলা গণহত্যা: অমর আত্মত্যাগের আলেখ্য
ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়
ইতিহাস কখনো কখনো এমন কিছু মুহূর্ত ধারণ করে, যা মানবতার বিচারে চিরকালের জন্য কলঙ্কিত হয়ে থাকে। ২০১৩ সালের ৫ মে রাতের ঢাকা সেরকমই এক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছে। মতিঝিলের শাপলা চত্বরে — যে স্থানটি বাংলাদেশের জাতীয় ফুলের নামে পরিচিত — সেদিন রাতের আঁধারে চালানো হয়েছিল এক নির্মম রাষ্ট্রীয় অভিযান। হেফাজতে ইসলামের লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশকে ছত্রভঙ্গ করতে গিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার যা করেছে, ইতিহাস তাকে 'শাপলা গণহত্যা' নামে চিনবে।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য সেই ঘটনার প্রেক্ষাপট, বর্বরতার চিত্র, তথ্য গোপনের প্রচেষ্টা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাসের তাৎপর্য তুলে ধরা।
কেন জেগে উঠেছিল লক্ষ মানুষ
২০১৩ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশের সামাজিক পরিমণ্ডলে একটি গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। কিছু ব্লগার ইন্টারনেটে ইসলাম ধর্ম ও মহানবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ-কে নিয়ে চরম আপত্তিকর ও বিদ্বেষমূলক লেখালেখি শুরু করেন। এই অবমাননার বিরুদ্ধে দেশের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করে — যার মধ্যে ধর্ম অবমাননার আইন প্রণয়ন, নাস্তিক্যবাদের বিস্তার রোধ এবং ইসলামবিরোধী কার্যক্রম বন্ধের দাবি ছিল।
এই ১৩ দফা দাবি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। এটি ছিল কোটি মুসলমানের ঈমানি আবেগের প্রকাশ। সরকার যখন এই দাবির প্রতি কোনো কার্যকর সাড়া দিল না, তখন হেফাজতে ইসলাম ৫ মে ঢাকা অভিমুখী মহাসমাবেশের ডাক দেয়। দেশের সর্বত্র থেকে — চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, রাজশাহী — লক্ষ লক্ষ মানুষ মতিঝিলের শাপলা চত্বরে এসে সমবেত হন। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, সেদিন ঢাকার বিভিন্ন স্থান মিলিয়ে ৫০ লক্ষেরও বেশি মানুষ একত্রিত হয়েছিলেন — যা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম গণজমায়েত।
সেই কালো রাত: অন্ধকারে অপারেশন
সন্ধ্যার পর থেকে পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে থাকে। অনেক সমাবেশকারী চলে গেলেও প্রায় ৫০,০০০–৭০,০০০ মানুষ তখনও শাপলা চত্বরে অবস্থান করছিলেন। তারা নামাজ পড়ছিলেন এবং ধর্মীয় নেতাদের বক্তব্য শুনছিলেন।
এরপর যা ঘটল, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। বিদ্যুৎ বন্ধ করে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযানে মতিঝিল এলাকায় ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডে আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র ও এতিম শিশুরা নিহত ও আহত হন। অভিযানের পরিকল্পনা ছিল সুসংগঠিত ও সুচিন্তিত। পুলিশের 'অপারেশন সিকিউর শাপলা', র্যাবের 'অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট শাপলা' এবং বিজিবির 'অপারেশন ক্যাপচার শাপলা' নাম দিয়ে অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাড়ে সাত হাজার সশস্ত্র সদস্য অংশ নেয় এবং দেড় লক্ষাধিক গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে রাত ১১টার দিকে বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করে দেন। এরপর শাপলা চত্বরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে মাদ্রাসাছাত্র ও পথচারীদের ওপর গণহত্যা চালায়। পরে লাশ সিটি করপোরেশনের গাড়িতে করে নিয়ে গুম করা হয়। নিহত ব্যক্তিদের পরিবার থানায় মামলা করতে গেলে তা নেওয়া হয়নি। এই একটি অনুচ্ছেদে বর্ণিত পাঁচটি অপরাধ — পরিকল্পিত অন্ধকার, গণহত্যা, লাশ গুম, পরিবারের মামলা না নেওয়া — এগুলো আলাদা আলাদাভাবেই বর্বরতার সর্বোচ্চ মাত্রাকে স্পর্শ করে।
লাশ গুমের অভিযোগ: ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য
শাপলা গণহত্যার সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো লাশ গুমের অভিযোগ। শাপলা চত্বর গণহত্যার পর ৬ মে ফজরের আজানের সময় লাশগুলো গুম করা হয়। ফজরের আজান — মুসলমানের ভোরের ডাক — সেই পবিত্র সময়ে রাষ্ট্র তার নিজের নাগরিকদের লাশ লুকিয়ে ফেলেছে। এর চেয়ে নির্মম বিদ্রূপ আর কী হতে পারে?
আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের বেওয়ারিশ লাশ দাফনের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৩ সালের মে মাসে অস্বাভাবিকভাবে ৩৬৭টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়, যা প্রতি মাসের গড় দাফনের চেয়ে চারগুণ বেশি। এই একটি পরিসংখ্যান সমস্ত অস্বীকারকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়। সরকার বলেছিল কেউ মারা যায়নি — কিন্তু মে মাসে চারগুণ বেশি বেওয়ারিশ লাশ কোথা থেকে এলো?
নিহতের সংখ্যা: কতটুকু জানি আমরা
নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। মানবাধিকার সংস্থা 'অধিকার' ঘটনার পরপর ৬১ জন নিহতের তথ্য জানিয়েছিল। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছিল শাপলা চত্বরের অভিযানে কেউ মারা যায়নি। যদিও তাদের এই বক্তব্য কেউই বিশ্বাস করেনি। গত ২ মে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৫ ও ৬ মে'র সহিংসতায় অন্তত ৫৮ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে সাতজন ছিলেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।
সম্প্রতি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহতদের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকায় ৯৩ জনের নাম রয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ লাশ গুম হয়েছে, মামলা নেওয়া হয়নি, পরিবারগুলো ভয়ে চুপ ছিল। যে ইতিহাস গোপন করা হয়, তার পূর্ণ তথ্য উদ্ধার করতে দশক লেগে যায়।
সাক্ষী নির্মূলের চেষ্টা: মিডিয়া বন্ধ
গণহত্যা সংঘটনের পাশাপাশি সরকার সেই রাতে তথ্য গোপনের জন্যও সমান সতর্ক ছিল। ৬ই মে'র ভোররাতে সরকার উস্কানিমূলক আচরণের অভিযোগে বিরোধীদলীয় গোষ্ঠীর মালিকানাধীন দুটি চ্যানেল — দিগন্ত টেলিভিশন এবং ইসলামিক টিভি — সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়, যেগুলো অপারেশনের কার্যকলাপ সরাসরি সম্প্রচার করছিল। অর্থাৎ, একই রাতে একটি সরকার তিনটি কাজ করেছে: বিদ্যুৎ বন্ধ করে অন্ধকারে হত্যা করেছে, লাশ গুম করেছে এবং সংবাদ সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে। এই তিনটি কাজ একসঙ্গে কেবল তারাই করে, যারা নিজেরাও জানে যা করছে তা অপরাধ।
মাওলানা মামুনুল হক, যিনি সেদিন রাতে শাপলা চত্বরে উপস্থিত ছিলেন, পরবর্তীকালে গ্রেফতার হয়েছেন এবং ৮৩ দিন কারাভোগ করেছেন। সেই কারাগারের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা 'কারাগার থেকে বলছি' গ্রন্থটি সেই দিনের ঘটনাকে 'নতুন বালাকোট' বলে অভিহিত করেছে — যেখানে সত্যের পক্ষের মানুষেরা সংখ্যার হিসেবে হেরেছেন, কিন্তু আদর্শে নয়।
বিচারের পথে: দেরিতে হলেও সত্যের যাত্রা
দীর্ঘ ১১ বছর অপেক্ষার পর ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শাপলা গণহত্যার বিচারের দাবি আবার সামনে আসে। শাপলা চত্বরে গণহত্যার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার আসামিদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর হেফাজতে ইসলাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখায় একটি অভিযোগপত্র দাখিল করে, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আরও ৪৯ জনকে ওই ঘটনার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ চারজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। এই বিচার প্রক্রিয়া শুধু একটি মামলার বিচার নয় — এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের জবাবদিহিতার একটি নজির স্থাপনের সুযোগ।
শাপলা গণহত্যার তুলনামূলক বিশ্লেষণ
অনেকেই এ ঘটনার তুলনা করেছেন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর সঙ্গে। সেদিনও রাতের আঁধারে ঘুমন্ত মানুষের উপর সশস্ত্র বাহিনী হামলা চালিয়েছিল। সেদিনও মানুষ জানতে পারেনি ঠিক কতজন মারা গেছে। সেদিনও পরিকল্পনাকারীরা মনে করেছিল — রাতের অন্ধকারে সব ঢাকা যাবে। কিন্তু ইতিহাস কিছুই ঢেকে রাখে না। পার্থক্য একটাই — ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী করেছিল, আর ২০১৩ সালে করেছিল বাংলাদেশের নিজের নির্বাচিত সরকার — নিজের নাগরিকদের বিরুদ্ধে। এই অর্থে শাপলা গণহত্যা আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। আরো পড়ুন ফিরে এসে খাবো
শহীদদের আত্মত্যাগ: অমরত্বের যে মাটি
শহীদনামা গ্রন্থটি তাদের কথা বলে — যারা ধর্মীয় আদর্শের পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রকাশিত তালিকায় দেখা গেছে, নিহতদের অধিকাংশই যুবক ছিলেন। তারুণ্যের সেই বলিদান — যখন একজন মানুষের সামনে পুরো জীবন পড়ে থাকে — তখন সে ইসলামের মান রক্ষায় বুকের পাঁজর পেতে দিয়েছে। এই আত্মত্যাগ শুধু কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ছিল না। ছিল সারাদেশ থেকে আসা সাধারণ মুসলমানদের। কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী — সবাই এক আহ্বানে একত্রিত হয়েছিলেন। তাদের বুকে কোনো অস্ত্র ছিল না, ছিল শুধু বিশ্বাস এবং ন্যায়ের দাবি।
হেফাজত নেতারা জানিয়েছেন, এই ঘটনায় আহতদের মধ্যে ১০ হাজার নেতাকর্মী পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। শহীদদের পাশাপাশি এই পঙ্গু মানুষগুলোর কথাও ইতিহাসকে মনে রাখতে হবে — তারা আজও বেঁচে আছেন সেই রাতের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দায়িত্ব
শাপলা গণহত্যার ইতিহাস কেবল অতীতের বিষয় নয় — এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যখন কোনো রাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের বিরুদ্ধে রাতের আঁধারে অস্ত্র তোলে, বিদ্যুৎ বন্ধ করে হত্যা করে এবং লাশ গুম করে — তখন সেই রাষ্ট্র আর 'রাষ্ট্র' থাকে না, পরিণত হয় হত্যাকারীর দলে।
আজকের প্রজন্মের দায়িত্ব তিনটি: প্রথমত, এই ইতিহাসকে জানা এবং জানানো। দ্বিতীয়ত, শহীদদের স্মৃতিকে সম্মান জানানো এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। তৃতীয়ত, বিচারের দাবিকে জীবন্ত রাখা — যতদিন পর্যন্ত এই গণহত্যার প্রতিটি পরিকল্পনাকারীর জবাবদিহিতা না হয়।
শাপলা চত্বর এখন স্বাভাবিক। ফোয়ারা চলছে, মানুষ হাঁটছে। কিন্তু সেই মাটির নিচে, সেই বাতাসে, সেই ইতিহাসের পাতায় এখনো লেখা আছে ২০১৩ সালের ৫ মে রাতের কথা। একটি সরকার সেদিন মনে করেছিল — অন্ধকারে যা হয়, তা ইতিহাস জানবে না। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল — পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলো কোনো বিদ্যুতের আলো নয়, মানুষের বিবেকের আলো। আর শহীদের রক্ত — তা কখনো মাটিতে মেশে না, তা পরিণত হয় ইতিহাসের অমোচনীয় কালি।
যে ইতিহাস চাপা পড়েছিল — আজ সেই ইতিহাস উঠে দাঁড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হচ্ছে, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হচ্ছে। বিচার হয়তো দেরিতে হচ্ছে, কিন্তু হচ্ছে। কারণ সত্য কখনো মরে না — সে কেবল অপেক্ষা করে তার সময়ের জন্য।
আল্লাহ শাপলা গণহত্যার সকল শহীদকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন এবং তাদের আত্মত্যাগকে এই জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রাখুন।
তথ্যসূত্র: শহীদনামা, কারাগার থেকে বলছি, মানবাধিকার সংগঠন 'অধিকার', The Business Standard, Prothom Alo, Daily Inqilab
লেখক: Alauddin
রামগতি লক্ষ্মীপুর
যোগাযোগ: 01871731941


0 মন্তব্যসমূহ
লেখাটি কেমন লাগলো? কমেন্ট করে জানালে খুব খুশি হবো।